খ্রীষ্টের জন্মোৎসব অার পৌষপার্বন একেই

“অস্তগামী সূর্যকে বরুণ বলে, তিনি আপনার গমনের দ্বারা রাত্রির সৃষ্টি করেন।” শতপথব্রাহ্মণে আছে, “অয়ং হি লোকো মিত্রঃ। অসৌ বরুণঃ।” অর্থাৎ ইহলোক মিত্র, পরলোক বরুণ। বোধ হয়, ইহাতে পাঠক বুঝিয়াছেন যে, বরুণ সর্বাবরণকারী অন্ধকার-তিনি সর্বত্রই আছেন, যেখানে কেহ গিয়া আলো করে, সেইখানে আলো হয়, নহিলে অন্ধকার, নহিলে বরুণ। আলো করেন মিত্র, সৌভাগ্যক্রমে এই বরুণ আর এই মিত্র অন্য আর্য জাতি মধ্যেও পূজিত। বরুণ যে গ্রীকদিগের Uranos তাহা বলিয়াছি। আবার তিনি প্রাচীন পারস্যজাতিদিগের দেবতা, এমনও কেহ কেহ বলেন। প্রাচীন পারস্যদিগের প্রধান দেবতা অহুরমজদ ভাষাবিদেরা জানেন যে, পারস্যেরা সংস্কৃত স স্থানে হ উচ্চারণ করে।-যথা, সিন্ধু স্থানে হিন্দু সপ্ত স্থানে হপ্ত। তেমনি অসুর স্থানে অহুর। এখন সুরাসুর শব্দ যাঁহারা ব্যবহার করেন তাঁহাদিগের কথার তাৎপর্য এই, অসুরেরা দেবতাদিগের বিদ্বেষী,৩ কিন্তু আদৌ অসুরই দেবতা, অসু নিশ্বাসে। অসু ধাতুর পর র প্রত্যয় করিয়া “অসুর” হয়। অর্থাৎ আকাশে সূর্যে পর্বতে নদীতে যাঁহাদিগকে প্রাচীন আর্যেরা শক্তিশালী লোকাতীত চৈতন্য মনে করিতেন, তাঁহারাই অসুর। বেদে ইন্দ্রাদি দেবগণ পুনঃ পুনঃ “অসুর” বলিয়া অভিহিত হইয়াছেন, ঋগ্বেদে বরুণকে পুনঃ পুন“অসুর” বলাহইয়াছে। এই অহুরমজদ নামের অহুর শব্দের তাৎপর্য দেব। অনেক ইউরোপীয় লেখক প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, এই অহুরমজদ বরুণ। ইনি বরুণ হউন বা না হউন, ইঁহার আনুষঙ্গিক দেবতা মিথ্র যে বরুণের আনুষঙ্গিক মিত্র, তদ্বিষয়ে সন্দেহ অল্পই। মিত্র সম্বন্ধে আর একটি রহস্যের কথা আছে। প্রাচীন পারসিকদিগের মধ্যে এই মিথ্রদেবের একটা উৎসব ছিল। সে উৎসব শীতকালে হইত। রোমকেরা যখন আশিয়ার পশ্চিম ভাগ অধিকৃত করিয়াছিলেন, তখন তাঁহারা স্বরাজ্য মধ্যে ঐ উৎসবটি প্রচলিত করেন। তার পর রোমক রাজ্য খ্রীষ্টীয়ান হইয়া গেল। কিন্তু উৎসবটি উঠিয়া গেল না। উৎসবটি শেষে খ্রীষ্টের জন্মোৎসব খ্রীষ্টমাসে (Christmas) পরিণত ও সেই নামে পরিচিত হইল। এই যে ইংরেজ মহলে আজি এত গাঁদাফুল ও কেকের শ্রাদ্ধ পড়িয়া গিয়াছে, সাহেবরা জানুন বা না জানুন, মানুন বা না মানুন, এ উৎসব আদৌ আমাদের মিত্রদেবের উৎসব। নোটে প্রমাণ উদ্ধৃত করিতেছি।৪

আবার সেই মিত্রদেবের উৎসবই বা কি? সেটা সূর্যের উত্তরায়ণের উৎসব। আমাদেরও যে উৎসব আছে-“মকর সংক্রান্তি”-যে দিন সূর্যের মকর রাশিতে সঞ্চার হয়। বাস্তবিক এখনকার “মকর সংক্রান্তি”, আর যে দিন সূর্যের মকর যথার্থ সঞ্চার হয়, সে এক দিনই নয়-মকরে প্রকৃত সঞ্চার, “মকর সংক্রান্তি” হইতে তিন সপ্তাহের কিছু বেশী পিছাইয়া পড়িয়াছে। এই ব্যতিক্রমের কারণ “Precession of the Equinoxes”. জ্যোতিষ শাস্ত্র যাঁহারা অবগত আছেন, তাঁহারা সহজে গণনা করিতে পারিবেন, কত দিনে এই ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে। সে যাহাই হউক, সাহেবদিগের এই আমাদের “মকর সংক্রান্তি” পৌষপার্বণ ও সাহেবদিগের “খ্রীষ্টমাস” একই। কথাটা “আষাঢ়ে” রকম, কিন্তু প্রমাণে কিছু ছিদ্র নাই।-

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.